সংবাদ শিরোনাম:
ইসরাত জাহানের খোলা চিঠি

ইসরাত জাহানের খোলা চিঠি

খোলা চিঠি জিপিএ ৫ শিশুর মানসিক বিকাশ
খোলা চিঠি জিপিএ ৫ শিশুর মানসিক বিকাশ

প্রত্যেক অভিভাবক চান তার সন্তান প্রত্যেক শ্রেণিতে ১ম স্থান অধিকার করবে।এজন্য যে বয়সে তার ঘুড়ি ওড়ানোর কথা, ঘাস, ফুল, পাখি দেখে পুলকিত হওয়ার কথা। মাঠেঘাটে ছুটোছুটি করার কথা। বিকেলের নরম রোদ্দুরে প্রজাপতির সাথে সখ্যতা তৈরি করার কথা। খেলাধুলা করার কথা। সেই বয়সে আপনি তাকে দেশের সেরা বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষা নামক অসুস্থ প্রতিযোগীতার মধ্যে ঠেলে দিয়ে একটা অসুস্থ জাতি তৈরি করতে যাচ্ছেন। আপনি হয়তো জানেন না আপনার সন্তানের শৈশবকে, স্বপ্নকে খুন করছেন প্রতিনিয়ত। মেধা আর মননকে ধ্বংসের সম্মুখীন করছেন। তার সৃজনশীলতাকে অঙ্কুরেই বিনাশ করছেন। এজন্য শিক্ষাকাঠামোও দায়ী। শিক্ষাকাঠামোকে ঢেলে সাজানো দরকার।

শিশুদের বিকাশ ও বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলনের জন্যে আরও কিছু বিষয় পয়েন্ট আকারে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

১. উদ্ভাবনী শক্তি বৃদ্ধি : বিজ্ঞানমুখী করতে হবে। ব্যবহারিক বিজ্ঞান শিখাতে হবে। শিশুদেরকে কৌতূহলী করে তুলতে হবে। প্রশ্ন করতে শিখাতে হবে। বিজ্ঞান মেলায় নিয়ে যেতে হবে।

২.কল্পনা শক্তি বৃদ্ধি : কল্পনা শক্তি বৃদ্ধির জন্যে বয়সভিত্তিক পাঠ্যবই বহির্ভূত বই পড়াতে হবে। হতে পারে; ছড়া,কবিতা,গল্প,উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনী, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ইতিহাস ইত্যাদি। তাতে তার মানসিক বিকাশ দ্রুত বৃদ্ধি পাবে এবং পাঠ্যবইয়ের পড়া সহজে আয়ত্ব করতে পারবে। প্রকৃতি ভ্রমণ করাতে হবে। তাকে শুনতে দিন পাখির কোরাস। পাতাপতনের সিম্ফনি! জলের গান! দর্শনীয় স্থানে বেড়াতে নিয়ে যান ছুটির দিনে। মাটির সুবাস আর ফুলের গন্ধ নিতে দিন।

৩. সামাজিকীকরণ : সামাজিকীকরণের কতগুলো মাধ্যম রয়েছে। তার মধ্যে পরিবারের ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথে বংশগতি কাঁচামাল জোগায়, সংস্কৃতি নকশা জোগায় এবং পরিবারে মাতা-পিতা কারিগর হিসেবে কাজ করেন।
সমবয়সী শিশু ও বড়দের সাথে মিশতে ব্যবহারিক আচরণ শেখাতে হবে।

৪. ক্রীড়া বিষয়ে দক্ষতা: শিশুকে খেলতে দিন তার সমবয়সী সঙ্গী কিংবা সহপাঠীদের সাথে। বিবেকানন্দ বলেছিলেন; “গীতা পড়ার চেয়ে ফুটবল খেলা উত্তম।”
পাড়া- মহল্লায় ক্রীড়ানুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারেন এতে শিশুর মানসিক ও শারীরিক গঠন উন্নত হবে এবং তার মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার গুনাবলী পরিস্ফুট হবে এবং সে স্বাবলম্বী হতে শিখবে।

৫. নৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ : এজন্য শিক্ষা নয়, চাই সুশিক্ষা। যে শিক্ষা একজন শিশুর নৈতিক মানদণ্ডকে উন্নত করার পাশাপাশি তার ভিতরকার মানবিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করবে। অভিভাবক, শিক্ষক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সকলকেই খেয়াল রাখতে হবে যাতে করে শিশুমনে সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ও সৃজনশীল চিন্তার প্রসার ঘটাতে পারে। শিশুর সৃজনশীলতা ও চিন্তার প্রসার ব্যাহত হতে পারে এমন কিছু করা যাবে না। মনে রাখতে হবে জীবনের শুরুতে স্বাভাবিক চিন্তা- চেতনা বাধাগ্রস্ত হলে তা থেকে বৈপরীত্য জন্ম নেয়। এ ধরণের পন্থা কখনো আদর্শিক নয় বরং সাংঘর্ষিক। সুতরাং সন্তানের কোমল চিন্তা- চেতনাকে লালন করতে হবে এবং এর বিকাশে আমাদের ভূমিকা হবে সার্বক্ষণিক সহায়ক।সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ব্যক্তির মূল্য ও মর্যাদা বৃদ্ধি করে।

৬. সুস্থ বিনোদন জগত চেনানো: শিশুতোষ বিনোদন মূলত খেলাধুলা কেন্দ্রিক এবং তা তাদের মানসিক বৃদ্ধি ও শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।শিশুদের জন্য বিনোদন বা বয়স্করা বিভিন্ন উপায়ে তা শিক্ষা দিয়ে থাকে। যেমন: পুতুল,মার্বেল খেলা, সঙ, কার্টুন। যেসবের প্রতি শিশুদের আবেদন রয়েছে।
শিশুরা সবসময় খেলাধুলা করতে ভালোবাসে এবং ইহা সর্বস্বীকৃত যে খেলাধুলা বিনোদনের পাশাপাশি শিশুর বিকাশে সহায়তা করে। শিশুদের খেলাধুলা নিয়ে “পিয়েতার ব্রুজেল দ্য এল্ডার” এর ১৫৬০ সালে অঙ্কিত “চিলড্রেন গেমস” নামক একটি প্রসিদ্ধ চিত্রে দেখানো হয়েছে শিশুরা নানারকম খেলায় মেতে আছে। শিশুদের কয়েকটি খেলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: মার্বেল, লুকোচুরি, সাবানের ফেনা ছোড়া ইত্যাদি।

৭. বয়সভিত্তিক যৌনশিক্ষা : সন্তানকে বয়সভিত্তিক যৌনশিক্ষা দিন। যৌনতা বিষয়ক কোনো প্রশ্ন করলে তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিবেন না। তাতে করে সে অন্য কারো কাছ থেকে এর উত্তর জানতে গিয়ে ভুল শিক্ষা গ্রহন করবে এবং বিপদগামী হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। তাই আপনার সন্তানকে সঠিক শিক্ষা প্রদান করুণ এবং বন্ধুসুলভ আচরণ করুণ। বয়ঃসন্ধিকালে মানসিক, শারীরিক, দৈহিক পরিবর্তনের কথা বুঝিয়ে বলুন। অনেক সময় এই পরিবর্তন নিয়ে তাদের মধ্যে এক ধরণের ভীতি তৈরি হয় এবং নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করে সবকিছু থেকে। তাকে বোঝান যে এটা একটা জৈবিক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় Sex Education নেই বললেই চলে। অবশ্যই Sex Education শিক্ষা কারিকুলাম অনুযায়ী পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। যে দু একটা অধ্যায় আছে তাও নামেমাত্র পড়ানো হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের কাছে বিষয়টা ধোঁয়াশা থেকে যায়। ফলে নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি তাদের লোভ কিংবা মোহ বেড়ে যায়। ঘটে নানারকম সামাজিক অবক্ষয়। অবক্ষয়ের হাত থেকে সুরক্ষা পেতে হলে অবশ্যই শিশুকে বয়স অনুযায়ী যৌনশিক্ষা দিতে হবে। তাহলেই একটা সুন্দর সমাজ গড়ে উঠবে।

আমার বোধে আসে না চার পাঁচ বছর বয়সী একজন শিশুকে প্রথম স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য ভর্তি পরীক্ষা কেনো দিতে হবে! কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার পিঠে ঝুলিয়ে দিচ্ছেন ব্যাগভর্তি বইয়ের বোঝা।

এই বোঝার ভারে তার মেরুদণ্ড শক্ত করার বদলে আজীবনের জন্য মেরুদণ্ড বাঁকা করে দিচ্ছেন। তা অধিকাংশ তথাকথিত অভিভাবকই বোঝেন না।

তার মানে আপনিই আপনার শিশুসন্তানকে শিক্ষার্থী না বানিয়ে পরীক্ষার্থী বানানোর অসুস্থ প্রতিযোগীতার জন্য শতভাগ দায়ী। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কিন্তু পরীক্ষা নয় কিংবা পরীক্ষায় প্রথম হওয়া নয় কিংবা জিপিএ 5 পাওয়া নয়।

অভিভাবক হিসেবে আপনার সন্তানকে শিশুবান্ধব সুস্থ পরিবেশ উপহার দেওয়া আপনার দায়িত্ব এবং কর্তব্য। অধিকাংশ অভিভাবকগন নিশ্চয় তা করেন না। যদি করতেন তাহলে জিপিএ 5 এর জন্য মরিয়া হয়ে উঠতেন না। আপনার সন্তানকে শিক্ষার্থী করে তুলুন। আগেই যদি পরীক্ষার্থী বানানোর চিন্তায় ঘুম নষ্ট করেন তবে সেটা আপনার চিন্তার দৈন্যতা ছাড়া আর কিছুই নয়। অনেক অভিভাবক প্রশ্নপত্র ফাঁস এর সঙ্গে জড়িয়ে যান শুধুমাত্র জিপিএ 5 এর জন্য।নৈতিকতার কতোটা স্খলন ঘটলে এমন জঘন্যতম ঘৃণ্য কাজের সাথে লিপ্ত হতে পারে!

জিপিএ 5 পেতে হবে এটা কোথায় লেখা আছে আমি জানি না। জিপিএ 5 না পেলেই বা কী হবে? বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাম জানেনা এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না হয়তো।

অথচ তিনি মাধ্যমিকের প্রিটেস্ট পরীক্ষাও দিতে পারেননি আর্থিক দৈন্যতার কারণে। স্বশিক্ষিত দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের বিদ্যাশিক্ষা বলতে পাঠশালার দ্বিতীয় শ্রেণি। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন লেখাপড়ায় ভালো ছিলেন না।প্রায়ই স্কুল থেকে অভিযোগ আসতো যে শিশু আইনস্টাইন ভীষণ ডানপিটে। তার সময়ে জিপিএ 5 এর নির্যাতন ছিলো না। তাতে তার বিজ্ঞানী হওয়া থমকে থাকেনি। লালন সাঁই অর্থাভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মুখ- দর্শন করতে পারেননি।জিপিএ 5 হয়তো সাময়িক স্বস্তি এনে দিতে পারে অভিভাবকের মনে। এই স্বস্তি থেকেই যে একদিন আপনার সন্তান ট্রমায় আক্রান্ত হতে পারে সেটা আপনার অজানা। কারণ আপনারা শিশুদের মনস্তত্ত্ব বোঝেন না বা জানেন না।ট্রমা শব্দটা এজন্য বললাম কারণ আমি নিজে শুনেছি দুই একজন অভিভাবক তার সন্তানকে বলছে যে ‘ তুমি যদি জিপিএ 5 না পাও তাহলে তোমার পড়াশোনা বন্ধ করে দেবো।’ যদিও বন্ধ করবে না কিন্তু অভিভাবক জানে না এই কথাটি শিশুমনে কতোটা মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে এবং এটা এক ধরণের মানসিক নিপীড়ন।

বইয়ের কালো অক্ষরে ছাপানো লেখা মুখস্থ করে ভালো ফলাফল করলেই তাকে মেধাবী বলা বোকামী।জিপিএ 5 পাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ একজন মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ হওয়া। আপনারা আপনাদের সন্তানকে শিক্ষায়, বিত্ত বৈভবে, পয়সায় বড় করতে চাইছেন। অথচ মানুষ করতে চাইছেন না। এই বড় কী আসলেই বড়!
জেনে রাখুন পাঠ্যবই পড়ে কেবল ভালো ফলাফল করা যায় হয়তো। প্রকৃত মানুষ হওয়া যায় না।

আপনারা, হ্যাঁ আপনারা চান আপনার পছন্দটাকে সন্তানের উপর চাপিয়ে দিতে।সন্তান ডাক্তার না হয় ইঞ্জিনিয়ার না হয় পাইলট হবে। এছাড়া যেনো কোনো পেশা নেই। আজ অব্দি কোনো অভিভাবকে বলতে শুনিনি যে আমার সন্তান চিত্রকর, লেখক, গবেষক, ভাস্কর্যকারিগর, বিজ্ঞানী, কবি, উপন্যাসিক, দার্শনিক হবে কারণ বেশিরভাগ অভিভাবকগন তাদের চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ।

এই সীমাবদ্ধতা, সেকেলে ধারণা থেকে বের হয়ে আসুন। জিপিএ 5 কেন্দ্রিক ট্রমা থেকে বের হয়ে আসুন। পড়াশোনা এবং পেশার ক্ষেত্রে সন্তানদেরকে স্বাধীনতা দিন।

ইসরাত জাহান

কবি, কলামিষ্ট, শিক্ষিকা।

খবরটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.




© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি ।
নির্মান ও ডিজাইন: সুশান্ত কুমার মোবাইল: 01748962840