সংবাদ শিরোনাম:
টাঙ্গাইলে একইসাথে দুই করোনা যোদ্ধার জন্মদিন উদযাপন এমপি মমতা হেনা লাভলীর টাঙ্গাইলে বন্যার্তদের মাঝে ত্রান বিতরণ সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন, টাঙ্গাইল জেলা শাখার নতুন কমিটি এমপি হিরোর বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর অপচেষ্টার অভিযোগ টাঙ্গাইলে ছাত্রলীগ কর্তৃক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচী পালন মানিক শিকদারের ব্যবস্থাপনায় টাঙ্গাইলে জাতীয় শোক দিবস পালন টাঙ্গাইলের পৌর মেয়র জামিলুর রহমানে মিরনের ব্যবস্থাপনায় টাঙ্গাইলে শোক দিবস পালন প্রবাসে থেকেও থেমে নেই টাঙ্গাইলের মুজাহিদুল ইসলাম শিপন মেয়র লোকমানের আত্মস্বীকৃত খুনি এমপি সাহেবের প্রোগ্রামে সক্রিয় জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি নিজেই প্রধান অতিথী, সভাপতিত্ব করবেন কে?
“কি জানি কিসের ও লাগি প্রান করে হায় হায়”

“কি জানি কিসের ও লাগি প্রান করে হায় হায়”

আখতার বানু (শেফালী)
আখতার বানু (শেফালী)

আখতার বানু (শেফালী)

স্মৃতি চারণ মূলক লেখা, জানিনা কে কি ভাবে নিবেন।
সময়টা ধরুন আটান্ন সাল থেকে পয়ষট্টি। আমার জীবনের শৈশব কাল থেকে কিশোরী কাল। টাংগাইল শহরের ব্যাপ্তি ছিলো তখন, এদিকে বিবেকানন্দ স্কুলের কিছু আগে থেকে শুরু হলে শেষ মাথা হলো শান্তিকুঞ্জ মোড়। আর আরেক পাশ হলো লৌজং নদীর পাড় থেকে শুরু শেষ থানা পাড়া।আমার স্মৃতিতে এতো টুকুই ছিলো টাংগাইল শহর। আমার টাংগাইল শহরে জীবন শুরু হয় আকুর টাকুর পাড়া।

এখন এই বয়সে এসে বুঝি রবীন্দ্রনাথ কেনো লিখেছিলেন “ভূল করে যা চাইনি তাই মোরে দাও”। ছোট বেলার স্মৃতির সাথে জড়িয়ে আছে খেলার সাথীদের মতো টাংগাইল শহরের দুই জন পাগলের স্মৃতি। তাদের কথা মাঝে মাঝে খুব মনে পড়ে।

একজন যুবতি একজন যুবক। গোলাপী আার আকালু। আমার বয়সী যারা বেঁচে আছেন তাদের কারো চোখে যদি আমার এই লেখাটা পড়ে আমার বিশ্বাস তারাও আবেগতাড়িত হবেন। কারন ঐ সময়ের টাংগাইল শহরের এমন কেউ নাই যে এই পাগলদের চিনতেন না।

গোলাপী থাকতো, আমি এবার টাংগাইল গিয়ে খেয়াল করি নাই ঐ বট গাছ টা এখনো আছে কিনা? বিন্দু বাসিনী বয়েজ স্কুলের কোনায়। ধরেন আকুর টাকুর পাড়া হতে শহরে ঢুকতে হাতের ডানদিকে যে কোনাটা আছে ঠিক তার উল্টাদিকে আগে ছিলো লোকে বলতো পুলিশ প্যারেড ময়দান এর কোনায় ছিলো বিরাট এক বট গাছ। আশেপাশের অনেকটা জায়গা এই গাছ ছায়া দিয়ে রাখতো। এই বট গাছের গোড়ার একছত্র অধিপতি ছিলো গোলাপী। বয়স আনুমানিক ৪০ /৫০।

দেখতে ছিলো বেশ সুন্দরী। মাথায় এলোমেলো ঝাঁকড়া ছোট ছোট লালচে চুল, ছোট করে কাটা। গায়ের রং ফর্সা, বোঝা যেতো সে কোনো ভালো ঘরের মেয়ে। কেউ কেউ বলতো সে নাকি কোনো পুলিশ অফিসারের বউ ছিলো। এখন ভাবি তাকে কোনো পাগলা গারদে রাখা হয় নাই। জানি না তখন ঢাকা সকালে রওয়ানা দিলে পৌছাতে রাত্রি হয়ে যেতো এই কারনে কি তাকে পাগলা গারদে দেওয়া হয় নাই, যাতায়াত ব্যবস্থার জন্য। যাই হোক আমরা যখন শহরে কোনো আত্নীয় বা বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার জন্য রওয়ানা দিতাম ঐ বটগাছের কাছে এসে আমরা থেমে যেতাম, তখনতো রিক্সার প্রচলনও তেমন হয় নাই।

গোলাপী কি করছে এটা দুর থেকে আগে পর্যবেক্ষণ করতাম, সে প্রায়ই বটগাছের শিকড়ে হেলান দিয়ে বিড় বিড় করে কথা বলতো তখন আমরা চোখ বুজে একদৌড়ে ঐ জায়গা পার হয়ে নিরালার মোড়ে গিয়ে থেমে হাঁপাতে থাকতাম। আবার ফেরা সময়ও একই পদ্ধতিতে ফিরতাম। আর যদি তার মাথা গরম থাকতো জোরে জোরে বকাবকি করতো, কারে করতো কে জানে?

কখনো তার পরনে থাকতো এলো মেলো করে পড়া লাল পেড়ে কোড়া সাদা শাড়ী, আবার কখনো থাকতো শুধূ ছালা পেচানো।।আশে পাশে দেখতাম ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পাউরুটি বিস্কুট। মনে হয় অনেকই তাকে এসব দিয়ে যেতো।

শীতের দিনে প্রায়ই দেখতাম লোক জন মনে হয় ওকে নতুন লেপ তোষক দিয়ে যেতো, সেগুলি ওর আাসপাশে ইতস্ততঃ পড়ে থাকতে দেখা যেতো। আবার মাঝে মাঝে তাকে দুই তিনদিনের জন্য দেখা যেতো না, মনে হয় তার আপন জনরা তাকে নিয়ে যেতো। যখন আবার দেখা যেতো তখন বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন লাগতো। তবে আমরা বড়দের সংগে যখন যেতাম তখন তাকে খুব একটা ভয় পেতাম না। সে কারো কোনো ক্ষতি করতো না। মাঝে মাঝেই খুব মনে পড়ে গোলাপী পাগলীর কথা।

আমাদের শৈশবের অনেকটা জুড়ে আছে গোলাপী পাগলী। আর ছিলো আকালু পাগল, বয়স আনুমানিক ২৩/২৪। সারা শহর সারা দিন চড়ে বেড়াতো। স্কুলে যাওয়ার সময় যদি দেখতাম। আকুর টাকুর পাড়া।স্কুল থেকে বেড়িয়ে যদি জরুরী কিছু কেনার জন্য স্কুলের কাছে কোনো দোকানে যেতাম দেখতাম সে তখন সেখানে।

গোলাপী পাগলীকে যেমন ভয় পেতাম আকালু পাগল কোনো রিএ্যাকশন না দেখানো পর্যন্ত ভয় পেতাম না। আকালু মনে হয় কোনো জেলে পরিবারের ছিলো, সারাক্ষন শুধুজাল বোনানোর আার মাছ ধরার কথা বলতো নিজে নিজে। কখনো কারো দেওয়া নতুন সার্ট বা লুঙ্গি পরা থাকতো কখনো শুধূ লেংটি। হাতে সব সময় একটা থালা থাকতো কোনো জানি না।

আমার বড় চাচার মেয়ে চামেলী, আমার ছোট বেলা থেকে বড় বেলার বান্ধবী শক্তি আমরা তিনজন খুব জ্বালাতাম আকালুকে। ছোট ছোট পাথর হাতে নিয়ে ওর পিছু পিছু যেতাম আর সুযোগ বুঝে ওকে ঢিল ছুড়তাম। ও যে পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে আমাদের দিকে উলটা দৌড় না দিতো আমরা ওর পিছু ছাড় তাম না।

ও আমাদের বিরক্ত হয়ে দৌড়ানী দিলে আমরা ভয়ে এসে বাসায় পালিয়ে থাকতাম। আমরা কখনো ওকে ব্যাথা দেওয়ার জন্য ঢিল ছুড়তাম না, ঢিল ছুড়তাম ও যাতে চেতে গিয়ে আমাদের দৌড়ানি দিতো এই জন্য। অবশ্য এর শাস্তিও একবার হাতে হাতে পেয়ে ছিলাম। আকালুর পিছে পিছে ঢিল হাতে যাচ্ছি আমি আর চামেলী , আকালু পিছ ফিরে এমন দৌড়ানি আমাদের দিলো আমরা এক দৌড়ে বাসার সামনে, বড় কাকার বাসার সামনে ছিলো একটা পুরানো বড় জাম গাছ। সেই গাছে হেলান দিয়ে আমি হাফাচ্ছি আার হাসছি চামেলী আর আমি । এমন সময় আমি অনুভব করলাম আমার পিঠের নীচে তুলতুলে কিছু নড়া চড়া করছে, চামেলী ছিলো ভীতু, পিছন ফিরে ওকে বললাম একটু
দেখতো কি? ও দেখেই ও আল্লাহ্ গো বলে দে দৌড় বাসার ভিতরে।

আমার তখন বুঝতে বাকি নেই যে আমি গাছে যে অনেক গুলি ছ্যাংগা এক সাথে জমে থাকে তার উপর হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছি। তার পর কি কি হলো নাইবা লিখলাম। শুধূ অজ্ঞান হই নাই এটুকু মনে আছে । চামেলীর সংগে দেখা হলে জানতে হবে এর পরেও আার আকালুকে জ্বালিয়েছি কিনা আমরা। কিন্তু আমার বড় চাচা মরহুম তায়েব উদ্দিন খান (আল্লাহ্‌ উনাকে বেহেশত্ নসীব করুন) আকালুকে অনেক দেখা শোনা করতেন, আদর করতেন।

আকালু কাকাকে বাবা ডাকতো। সারা দিন ও কোথায় কোথায় থাকতো কে জানে কিন্তু রাত যতোই গভীর হোক ও চাচার বাসার বারান্দায় ঠিক ফিরে আসতো বাবা বাবা ডাকতে ডাকতে। ওর জন্য চাচা বারান্দায় যত্ন করে ভাত দিয়ে রাখতেন। ওর শোবার ব্যবস্হা করে রাখতেন বারান্দায়। কখনো খেয়ে দেয়ে চুপ চাপ শুয়ে থাকতো কখনো বিড় বিড় করে মাছ ধরার গল্প করতো।

ওর কথা বার্তায় মনে হতো ও ছিলো হিন্দু পরিবাররের। টাংগাইল ছিলো তখন ছোট্ট মফস্বল শহর, তখন এই শহরের সবাই চিনতো আকালু ও গোলাপীকে। জানিনা এতো দিন পরে কেন যে গোলাপী পাগলী আর আকালু পাগলার কথা মনে পড়ে মনটা খারাপ হলো। ওই যে “ভূল করে যা চাইনি তাই মোরে দাও।আজ কাল রবীন্দ্র নাথের “দূূর্লভ মানব জনম”কবিতাটার প্রতি খুব মায়া পড়ে গেছে।

খবরটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.




© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি ।
নির্মান ও ডিজাইন: সুশান্ত কুমার মোবাইল: 01748962840