সংবাদ শিরোনাম:
টাঙ্গাইলে একইসাথে দুই করোনা যোদ্ধার জন্মদিন উদযাপন এমপি মমতা হেনা লাভলীর টাঙ্গাইলে বন্যার্তদের মাঝে ত্রান বিতরণ সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন, টাঙ্গাইল জেলা শাখার নতুন কমিটি এমপি হিরোর বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর অপচেষ্টার অভিযোগ টাঙ্গাইলে ছাত্রলীগ কর্তৃক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচী পালন মানিক শিকদারের ব্যবস্থাপনায় টাঙ্গাইলে জাতীয় শোক দিবস পালন টাঙ্গাইলের পৌর মেয়র জামিলুর রহমানে মিরনের ব্যবস্থাপনায় টাঙ্গাইলে শোক দিবস পালন প্রবাসে থেকেও থেমে নেই টাঙ্গাইলের মুজাহিদুল ইসলাম শিপন মেয়র লোকমানের আত্মস্বীকৃত খুনি এমপি সাহেবের প্রোগ্রামে সক্রিয় জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি নিজেই প্রধান অতিথী, সভাপতিত্ব করবেন কে?
৭ মার্চের ভাষণের প্রেক্ষাপট

৭ মার্চের ভাষণের প্রেক্ষাপট

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চ এর ভাষণ
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চ এর ভাষণ

সামরিক জান্তাশাসিত দেশ না হয়ে পাকিস্তান যদি হতো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, তাহলে একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থাকতেন তার প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা।

একটি অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে তিনি ৭ মার্চ স্মরণকালের বৃহত্তম জনসভায় যে ভাষণ দেন, সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি এখন অনেকেরই প্রায় মুখস্থ। সে দিন তাঁর ওই ভাষণ দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না। কোন পরিস্থিতিতে তিনি ওই ভাষণ দিয়েছিলেন, তা না জানলে বর্তমান প্রজন্মের মানুষের কাছে পাকিস্তান রাষ্ট্র, তার শাসকশ্রেণির চরিত্র এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিটি পরিষ্কার হবে না। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের উচিত পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ৭ই মার্চের ভাষণের প্রেক্ষাপট ও তার প্রভাব তুলে ধরা।

যেকোনো সুস্থ্য চিন্তার মানুষের কাছে বিস্ময়কর মনে হবে, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার ২৩ বছরের মধ্যে কোনো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০-এর ডিসেম্বরে।

সেই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশে জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের ১৬৭টি লাভ করে। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ ছিল ৩০০ আসনবিশিষ্ট। পশ্চিম পাকিস্তানে ৮৩ আসন পেয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। ওই নির্বাচন ছিল বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার প্রতি জনগণের রায়। বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা এক্ষেত্রে কোন সন্দেহ নেই।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, জুলফিকার আলী ভুট্টোর পিপিপি, কাইয়ুম খানের মুসলিম লীগ প্রভৃতি চক্র গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বাইরে গিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখার অন্যতম জঘণ্য ষড়যন্ত্র শুরু করে।

এদিকে বঙ্গবন্ধু গণতান্ত্রিক রাজনীতির রীতিনীতিতে অবিচল থাকেন। ৩ জানুয়ারি ১৯৭১, তিনি তাঁর দলের জনপ্রতিনিধিদের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় শপথ গ্রহণ পরিচালনা করেন। ৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা এবং জনগণের রায়ের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার শপথ পাঠ করান।

আর ওইদিকে দেখা যায় ধর্মের কথা বলে চরমভাবে বিভ্রান্তিতে মানুষকে বিভ্রান্ত করেন। তারা ক্ষমতা কোনোক্রমেই পূর্ব পাকিস্তানে দিতে রাজি হন নি।

শাসকগোষ্ঠীর চলমান ষড়যন্ত্রের মধ্যেই ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো সংবাদ সম্মেলন করে জানান, তিনি ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করবেন না। তিনি অধিবেশন ‘বয়কট’ করবেন এই জন্য যে, ৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচিত হলে পাকিস্তানের স্থিতিশীল ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নেই। তা ছাড়া ঢাকায় এলে তাঁর দলের সদস্যরা জিম্মি হয়ে পড়বেন। এসব ছিল তাঁর দায়িত্বজ্ঞানহীন উক্তি ও ষড়যন্ত্রের অংশ। মূলত তাদের ভেতরে যে ফন্দি ছিল তা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অত্যাচার বলবৎ রাখার নীল নকশা। শোষণ বঞ্চনার নকশা ধরে রাখা।

২২ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া হঠাৎ তাঁর মন্ত্রিপরিষদ বাতিল করেন। পিপলস পার্টির মুখপাত্র আবদুল হাফিজ পীরজাদা দাবি করেন, তাঁদের দলের চাপেই প্রেসিডেন্ট তাঁর মন্ত্রিপরিষদ বাতিল করেছেন। সব কিছুই তারা তাদের মত করে চালাতে থাকে। দায়িত্ব হস্তান্তরের কোন চিন্তা তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়নি।

এসব আলামত দেখে বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারেন বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। এর মধ্যে ভুট্টো করাচিতে সাংবাদিকদের বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তা হবে ‘ডিকটেটরশিপ অব দ্য মেজরিটি’—সংখ্যাগরিষ্ঠের একনায়কত্ব। মানুষকে বিভ্রান্ত করার সর্বময় চেষ্টা তারা করতে থাকে।

এ জাতীয় আজেবাজে বক্তব্যের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। শুধু ২৮ ফেব্রুয়ারি বলেন, ভুট্টোর বক্তব্য গণতন্ত্রের পরিপন্থী। গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলই সরকার গঠন করে। বঙ্গবন্ধু বলেন, ভুট্টো সাহেবের ইচ্ছা পাকিস্তানে সংখ্যালঘু দলের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হোক, ডিকটেটরশিপ অব দ্য মাইনরিটি বাংলার মানুষ মেনে নেবে না। তবুও তাদের লজ্জ্বা হয়নি।

তাদের মনগড়া যুক্তি নিয়েই তারা পরে থাকে। আসলে তাদের কথায় কোন যুক্তি ছিল না, তা তারা নিজেরাও জানতো।

বঙ্গবন্ধু বলেন, আমরা ৬ দফা কারও ওপরে জোর করে চাপিয়ে দেব না। একজন সদস্যও যদি যুক্তিযুক্ত কোনো দাবি করেন, তা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান। আমরা সকলের বক্তব্যকে যথাযথভাবে মূল্যায়ণ করবো। সবার কথা শুনবো। আমরা কাউকে অসম্মান করবো না।

বঙ্গবন্ধু বলেন, দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি মাওলানা ভাসানী, নুরুল আমিন, আতাউর রহমান খান, মোজাফ্ফর আহমদসহ অন্যান্য দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। অবাঙালি নাগরিকদের নিরাপত্তা সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তাঁরা এই মাটিরই সন্তান, এ দেশ তাঁদেরও দেশ, তাঁরা জনগণের সঙ্গেই থাকবেন; জনগণই তাঁদের নিরাপত্তা দেবে।’ সবাই নিরাপদ এই বিষয়ে বঙ্গবন্ধু আশ্বস্ত করেন।

৩ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যোগদানের প্রস্তুতি হিসেবে ১ মার্চ আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠক হচ্ছিল পূর্বাণী হোটেলে। সেই সময়ই রেডিওতে ঘোষিত হয়, প্রেসিডেন্ট জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেছেন।

শাসকশ্রেণির স্বৈরতান্ত্রিক আচরণে বাংলাদেশের মানুষ আগেই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। ইয়াহিয়ার বেতার ভাষণের সঙ্গে সঙ্গে দলমত-নির্বিশেষে জনগণ রাজপথে নেমে পড়ে। তাদের কণ্ঠে স্লোগান: ‘তোমার আমার ঠিকানা—পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘পিন্ডি না ঢাকা—ঢাকা ঢাকা’ ইত্যাদি। হাজার হাজার স্লোগানে মুখরিত থাকে দুই খন্ডিত পাকিস্তানের আকাশ বাতাস।

বঙ্গবন্ধু সংসদীয় দলের বৈঠক স্থগিত করে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি ছয় দিনের কর্মসূচি দেন। ২ মার্চ ঢাকায় পূর্ণ হরতাল এবং ৩ মার্চ সারা দেশে হরতাল। তিনি ঘোষণা দেন, ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসভায় ভাষণ দেবেন। তিনি বলেন, ভুট্টোর দল ও কাইয়ুম খানের মুসলিম লীগ ছাড়াও আমরা শাসনতন্ত্র রচনা করতে পারব।

পূর্বাণীর চত্বর তখন লোকে লোকারণ্য। সেখান থেকে বর্তমান বিমান বাংলাদেশ কার্যালয়ের সামনে ‘পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স’ সাইনবোর্ডটির ওপরে কাগজ সেঁটে লেখা ‘বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স’।

মতিঝিল থেকে গুলিস্তান চত্বরে এসে দেখি যেসব ভবনের দেয়ালে লেখা ছিল ‘জিন্নাহ এভেনিউ’, সেখানে ‘বঙ্গবন্ধু এভেনিউ’ আলকাতরা দিয়ে লেখা। বস্তুত ইয়াহিয়ার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তানের কবর খোঁড়া হয়ে যায়। তারা ক্ষমতা ধরে রাখতে চাইলো আর মানুষ মন থেকে তাদের কবর রচনা করে দিল।

ওই দিনই বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা সহযোগিতা করতে চাই। তিনি পাকিস্তানিদের উদ্দেশে বলেন, আসুন, সমস্যা সমাধানে সহযোগিতা করুন। যদি অসহযোগিতা করেন, আমরাও শান্তিপূর্ণ অসহযোগের কর্মসূচি দেব। ২৩ বছর যাবৎ একই ষড়যন্ত্র করছেন, আর ষড়যন্ত্র করবেন না।’ বঙ্গবন্ধু কখনোই অপ্রীতিকর কোন কর্মসূচির পক্ষে ছিলেন না। তিনি কখনোই বলেন নি, আন্দোলনের নামে জনগণের কোন ভোগান্তি হোক।

কোনো রিপোর্টার জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কি একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন?’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘অপেক্ষা করুন। আমার জনগণ আমার সঙ্গে আছে। আমরা শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই। আমরা ভালোর আশা করছি, তবে মন্দের জন্যও প্রস্তুত আছি। জনগণের অধিকার অর্জনের লড়াই চলবে। বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির জন্য কোনো ত্যাগই বড় নয়।’ তিনি বলেন, ‘কাল থেকেই কর্মসূচি চলবে। ৭ মার্চ তিনি পরবর্তী কর্মসূচি জানাবেন রেসকোর্সের জনসভা থেকে।” বারবার তাকে অনেকে উস্কানি দিলেও তিনি মাথা ঠান্ডা রেখেছেন সবসময়।

১ মার্চ থেকেই বাংলাদেশের মানুষ রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিল ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু কী ঘোষণা দেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ওপর দেশের মানুষ এতটাই ক্ষুব্ধ ছিল যে স্বাধীনতার চেয়ে কম কিছু তারা আশা করছিল না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু একজন গণতান্ত্রিক নেতার মতোই অত্যন্ত সংযত ছিলেন। যে জন্য দেশের বাইরের জনমত ছিল তাঁর পক্ষে। সারাবিশ্বই সবসময় তার পক্ষে ছিল।

ষাটের দশকের শেষ দিক থেকে পৃথিবীর অনেক দেশেই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছিল। নাইজেরিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতার জন্য বায়াফ্রা সশস্ত্র সংগ্রাম করছিল। রক্তপাত হচ্ছিল কিন্তু আন্তর্জাতিক সমর্থন পাচ্ছিল না বিদ্রোহীরা।

ইন্দোনেশিয়াতেও হচ্ছিল বিছিন্নতাবাদী আন্দোলন। সেসব আন্দোলনের নেতিবাচক দিক ও দুর্বলতা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর ধারণা ছিল। তিনি উপলব্ধি করেন হঠকারিতার পরিণতি শুভ হয় না এবং হঠকারী নেতা কখনো বিশ্ববাসীর সমর্থন পান না। ওই সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুর সংযত আচরণের জন্য আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন তাঁর দিকে এবং তাঁর প্রতিপক্ষ পাকিস্তান সরকার ধিক্কৃত।

একাত্তরে যোগাযোগব্যবস্থা এখনকার মতো ছিল না। গণপরিবহন ছিল খুবই কম। তা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের সভায় যোগ দিতে হাজার হাজার মানুষ ঢাকা আসে। অনেকে আশপাশের জেলা থেকে হেঁটে এসেছে। সকালবেলায়ই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অর্ধেকের বেশি ভরে যায়। সাড়ে ১০টার দিকে আমি ঢাকা ক্লাবের সামনে এসে দেখি মাঠ প্রায় পূর্ণ। স্বাধীনতা লাভের স্পৃহা মানুষের চোখেমুখে। আজোবধি স্বাধীন বাংলাদেশেও বুঝি এরকম আর কোন মহাসম্মেলন হয়নি।

জ্বালাময়ী উত্তেজক বক্তৃতা দেওয়ার জন্য বিখ্যাত বহু বাঙালি জননেতা। বঙ্গবন্ধুও ছিলেন অনলবর্ষী বক্তা। পল্টন ময়দানে তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতাও শুনেছি। ৭ মার্চের তাঁর ভাষণটি খুব সংক্ষিপ্তও ছিল না, দীর্ঘও ছিল না। সব দিক থেকে তাঁর পরিমিতিবোধের প্রকাশ ঘটে তাঁর সেদিনের ভাষণে। বক্তৃতা নয়, তিনি যেন জনসমুদ্রের মানুষগুলোর সঙ্গে সংলাপ করছেন। তার সেদিনের বক্তৃতাটি সত্যিকারের দেশপ্রেমিকদের মনে আজও শক্তি সঞ্চার করে।

তাঁর অনুসারী ও শ্রোতাদের সাংস্কৃতিক মান সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর সুস্পষ্ট ধারণা ছিল। তিনি তাদের বোধগম্য ভাষাতেই কথা বলেছেন। তিনি পাকিস্তানের ২৩ বছরের রাজনীতির পটভূমি তুলে ধরেছেন। সরকারি বাহিনীর হাতে মানুষ মারা যাচ্ছিল প্রতিদিন।

২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘২৫ তারিখ অ্যাসেমব্লি ডেকেছেন। রক্তের দাগ শুকায় নাই। রক্তে পাড়া দিয়ে, শহীদের উপর পাড়া দিয়ে, অ্যাসেম্বলি খোলা চলবে না।’ বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। দেশের মানুষের অধিকার চাই।…আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায় রাখতে পারবা না।’ তার বক্তব্যের প্রতিটি কথা ছিল যেন যাদুতে মাখা। হিসেব কষে কষে যেন প্রতিটি শব্দ চয়ন করেছিলেন তিনি।

তাঁর ঘোরতর প্রতিপক্ষ ও শত্রুকেও সৌজন্য রক্ষা করে সম্বোধন করেছেন। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, জনাব ইয়াহিয়া খান সাহেব, জনাব ভুট্টো সাহেব। রাজনৈতিক সমস্যা সমাধান এবং জাতীয় পরিষদে যোগদানের এমন চারটি শর্ত ঘোষণা করেন যা কারও পক্ষে অযৌক্তিক বলা সম্ভব ছিল না। সে জন্য পৃথিবীর মানুষ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দেয়। তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে জাতির উদ্দেশ্যে বিধ্বংসী এই ভাষণ দেন। যে ভাষেণে বাংলার প্রতিটি মানুষ জেগে উঠে। বুক পেতে দেয় গোলার সামনে।

স্বনামধন্য অথচ অদূরদর্শী অনেককে, এমনকি তাঁর দলের কোনো কোনো নেতাকেও বলতে শোনা গেছে, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন না কেন?

তা তিনি করলে তা হতো বাঙালির জন্য চরম আত্মঘাতী। তাঁকে আখ্যায়িত করা হতো বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে। তিনি জনগণনন্দিত গণতান্ত্রিক নেতা থাকতেন না। তিনি শান্তিপূর্ণ উপায়ে আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের স্বাধিকার অর্জনের পথ খোলা রাখেন।

৭ মার্চের পরও তিনি ইয়াহিয়া, ভুট্টোর সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন। তাঁরা চেয়েছেন অস্ত্রের মাধ্যমে বাঙালিকে দাবিয়ে রাখতে। কিন্তু নিরস্ত্র বাঙালিকে সশস্ত্র পশুশক্তি নিশ্চিহ্ন করতে চাওয়ায় বিশ্বজনমত বাঙালির পাশে দাঁড়ায়। বঙ্গবন্ধু সবসময় নিরস্র বাঙালির নিরাপত্তার কথা ভেবেছেন। ভেবেছেন তাদের কিভাবে নিরাপদ রাখা যায় আর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ভেবেছেন কীভাবে গোলার ভয় দেখিয়ে ভীত সন্ত্রস্থ করে এদের লুটেপুটে খাওয়া যায়।

আট কোটি বাঙালি ওই মুহূর্তে তাদের অন্তরে যে আবেগ ও স্বপ্ন ধারণ করছিল, তারই প্রকাশ ঘটে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের শেষ বাক্যে। মুক্তি ও স্বাধীনতাসংগ্রামের নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে।

এমন একটি সময়ে তিনি এমন একটি বক্তব্য সকলের সামনে উপস্থাপন করেন, যে বক্তব্যের কারনে যে কোন মুহুর্তে তাকে মৃত্যু করণ করে নিতে হতে পারতো। সবসময় ঘাতকদের বুলেট ছিল তকার বুকে তাক করা কিন্তু তিনি কখনো দমে জাননি। তিনিই আমাদের বঙ্গবন্ধু। তিনি থাকবেন আজীবন আমাদের সকলের মাথার মুকুট হয়ে।

খবরটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.




© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি ।
নির্মান ও ডিজাইন: সুশান্ত কুমার মোবাইল: 01748962840